হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানোকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সিনকোপ (Syncope) বলা হয়। এই ঘটনাটি সাধারণত ঘটে যখন মস্তিষ্কে হঠাৎ করে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। অনেকেই এই ঘটনাটিকে সাধারণ দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণের ফল মনে করে অবহেলা করেন, কিন্তু এটি প্রায়শই হৃদরোগের একটি গুরুতর বিপদ সংকেত হতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাকিবুল হাসান তুষার।
ডা. তুষার বলেন, “হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়। এর পেছনের কারণ অনুসন্ধানের জন্য দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এটি হৃদরোগের ইঙ্গিত দেয়।”
হৃদরোগের কারণে সিনকোপ কেন হয়?
হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে হৃদরোগ একটি প্রধান কারণ। হৃদরোগের কারণে সিনকোপ সাধারণত ঘটে যখন হৃৎপিণ্ড মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন (Arrhythmia): হৃৎস্পন্দন যদি খুব ধীর (bradycardia), খুব দ্রুত (tachycardia) বা অনিয়মিত হয়, তবে হৃৎপিণ্ড সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
- হৃদপিণ্ডের ভাল্বের সমস্যা: হৃৎপিণ্ডের ভাল্বগুলো সংকীর্ণ (stenosis) হয়ে গেলে বা লিক (regurgitation) থাকলে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। এর ফলে হঠাৎ করে শারীরিক পরিশ্রম বা চাপ দিলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যেতে পারে, যার ফলশ্রুতিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
- জন্মগত হৃদরোগ: কিছু জন্মগত হৃদরোগের কারণেও রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, যা সিনকোপের কারণ হতে পারে।
- মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (Myocardial Infarction): হার্ট অ্যাটাকের সময়ও ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
- অন্যান্য কারণ: অনেক সময় হাইপোটেনশন (নিম্ন রক্তচাপ) বা রক্তনালী সংক্রান্ত সমস্যার কারণেও সিনকোপ হতে পারে, যা সরাসরি হৃদরোগ না হলেও হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতার সাথে সম্পর্কিত।
লক্ষণ ও উপসর্গ:
হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা চিনে রাখা জরুরি:
- মাথা হালকা লাগা বা ঝিমঝিম করা (Dizziness)
- দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা
- বমি বমি ভাব
- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি
- বুক ধড়ফড় করা
কখন দুশ্চিন্তা করবেন ও করণীয় কী?
ডা. তুষার জোর দিয়ে বলেন, “যদি কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান, তবে এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। যদি সম্ভব হয়, রোগীকে অবিলম্বে কোনো নিরাপদ স্থানে শুইয়ে দিন এবং তার পা দুটি সামান্য উঁচু করে দিন। জ্ঞান ফিরে আসার পর দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”
নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন:
- যদি সিনকোপ ঘন ঘন হয় বা পুনরাবৃত্তি হয়।
- যদি সিনকোপের সাথে বুকে ব্যথা বা বুক ধড়ফড় করার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
- যদি ব্যক্তির পূর্বে কোনো হৃদরোগের ইতিহাস থাকে।
- যদি পারিবারিক ইতিহাসে হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনা থাকে।
নির্ণয় ও চিকিৎসা:
ডা. তুষার জানান, সিনকোপের কারণ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়, যেমন:
- ইসিজি (ECG): হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরীক্ষার জন্য।
- হল্টার মনিটর: ২৪ ঘণ্টা বা তার বেশি সময়ের জন্য হৃৎস্পন্দন রেকর্ড করার জন্য।
- ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram): আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের গঠন ও কার্যকারিতা দেখার জন্য।
- টিলেট টেবিল টেস্ট (Tilt Table Test): রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন কিভাবে শরীরের অবস্থানের সাথে পরিবর্তিত হয় তা দেখার জন্য।
চিকিৎসা নির্ভর করে সিনকোপের কারণের উপর। যদি হৃদরোগই এর কারণ হয়, তবে তার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা যেমন- পেসমেকার স্থাপন, ওষুধ বা অন্যান্য পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়।
ডা. তুষার বলেন, “রাজশাহীতে আমাদের এখানে আধুনিক ডায়াগনস্টিক এবং চিকিৎসার সব ধরনের সুবিধা রয়েছে। সিনকোপকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া হয়তো আপনার শরীর আপনাকে কোনো গুরুতর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করছে।”