সহজে হাঁপিয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করা একটি সাধারণ লক্ষণ, যা আমরা প্রায়ই অবহেলা করি। তবে এটি অনেক সময় হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। আমাদের হৃদপিণ্ড যখন তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারায়, তখন ফুসফুসে রক্ত জমা হতে শুরু করে, যার ফলস্বরূপ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাকিবুল হাসান তুষার।
হৃদরোগজনিত শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণ
ডা. তুষার বলেন, “হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতা বা কার্যক্ষমতা কমে গেলে, ফুসফুসে অতিরিক্ত fluid বা তরল জমা হয়। এটিকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Pulmonary Congestion বলা হয়। এর ফলে breathing discomfort বা শ্বাসকষ্ট হয়। এই ধরনের শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণগুলো হলো:”
- হার্ট ফেইলর (Heart Failure): এটি হৃদরোগজনিত শ্বাসকষ্টের সবচেয়ে বড় কারণ। যখন হৃদপিণ্ড শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে পারে না, তখন রক্ত ফুসফুস থেকে হৃদপিণ্ডে ফেরত আসতে বাধা পায়। এতে ফুসফুসের রক্তনালীতে চাপ বেড়ে যায় এবং তরল বেরিয়ে ফুসফুসের বায়ুথলিতে জমা হয়। এর ফলে শ্বাসকষ্ট হয়।
- করোনারি আর্টারি ডিজিজ (Coronary Artery Disease): হৃদপিণ্ডের রক্তনালী সরু হয়ে গেলে হৃদপেশীর কার্যকারিতা কমে যায়, যা হার্ট ফেইলরের কারণ হতে পারে।
- হার্টের ভাল্বের সমস্যা: হৃৎপিণ্ডের ভাল্বগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে, যেমন – সংকীর্ণ (stenosis) বা লিক (regurgitation) থাকলে, রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধে।
- হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশীর দুর্বলতা (Cardiomyopathy): বিভিন্ন কারণে হৃদপিণ্ডের মাংসপেশী দুর্বল বা পুরু হয়ে গেলে তার পাম্প করার ক্ষমতা কমে যায়, যা শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে।
- উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে হৃদপেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
হৃদরোগজনিত শ্বাসকষ্টের লক্ষণ
হৃদরোগের কারণে শ্বাসকষ্ট সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট উপায়ে প্রকাশ পায়। এই লক্ষণগুলো চিনতে পারা খুবই জরুরি:
- অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট: সিঁড়ি ভাঙা, হাঁটাচলা বা হালকা কাজ করতে গিয়ে সহজে হাঁপিয়ে যাওয়া।
- রাতে শোয়ার সময় শ্বাসকষ্ট: রাতে শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় এবং উঠে বসলে বা বালিশ উঁচু করে রাখলে কিছুটা আরাম বোধ হয়।
- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস: কোনো কারণ ছাড়াই ঘন ঘন বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
- শ্বাসকষ্টের সাথে কাশি: অনেক সময় শুষ্ক কাশি হতে পারে, যা বিশেষত রাতে বেশি হয়।
- পা ও গোড়ালিতে ফোলা: হৃদরোগজনিত কারণে শরীরে জল জমার ফলে পা, গোড়ালি বা পেটে ফোলাভাব দেখা দেওয়া।
- হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট (Acute Pulmonary Edema): এটি একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে ফুসফুসে অতিরিক্ত জল জমার ফলে শ্বাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
করণীয়: কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
ডা. তুষার জোর দিয়ে বলেন, “যদি আপনি সহজে হাঁপিয়ে যান বা উপরোক্ত লক্ষণগুলো আপনার মধ্যে দেখা যায়, তবে এটিকে সাধারণ দুর্বলতা মনে করে অবহেলা করবেন না। দ্রুত একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি।”
- দ্রুত রোগ নির্ণয়: একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন- ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram), ইসিজি (ECG), বুকের এক্স-রে এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শ্বাসকষ্টের আসল কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
- জীবনযাত্রার পরিবর্তন: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কম লবণযুক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত তরল গ্রহণ সীমিত করা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- ওষুধ সেবন: হৃদরোগের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন ওষুধ যেমন- ডাইইউরেটিক (জল কমানোর ওষুধ), বিটা ব্লকার বা এসিই ইনহিবিটর প্রেসক্রাইব করতে পারেন।
- বিশেষ চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে, হৃদরোগের ধরণ অনুযায়ী, ভাল্বের অস্ত্রোপচার, পেসমেকার স্থাপন বা এনজিওপ্লাস্টির প্রয়োজন হতে পারে।
ডা. তুষার আরও বলেন, “রাজশাহীর মানুষদের জন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হার্ট ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে আমার তত্ত্বাবধানে সব ধরনের হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা ও পরামর্শের ব্যবস্থা রয়েছে। শ্বাসকষ্টকে অবহেলা করবেন না। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে।