হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলর কীভাবে আমাদের হৃদযন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে? লক্ষণ, কারণ ও করণীয় সম্পর্কে জানুন – ডা. রাকিবুল হাসান তুষার স্যারের অভিজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গিতে

আমাদের হৃদপিণ্ড একটি শক্তিশালী পাম্পের মতো, যা অবিরামভাবে সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে। কিন্তু যখন কোনো কারণে এই পাম্পের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়, তখনই হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলরের মতো মারাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে। এই দুটি অবস্থাই হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং জীবন হানিকরও হতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাকিবুল হাসান তুষার

ডা. তুষার বলেন, “হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলর – এই দুটি শব্দ প্রায়শই আমরা শুনে থাকি এবং অনেকেই এই দুটিকে গুলিয়ে ফেলেন। তবে এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা, যদিও উভয়েই হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।”


হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack): হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া

হার্ট অ্যাটাক ঘটে যখন হৃদপিণ্ডের কোনো একটি রক্তনালী (করোনারি ধমনী) হঠাৎ করে জমাট বাঁধা রক্তের কারণে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হৃদপিণ্ডের সেই অংশে অক্সিজেন এবং পুষ্টির অভাব দেখা দেয়, এবং দ্রুত হৃদপেশী ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ:

  • বুকে তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি: বুকের মাঝখানে বা বাম দিকে তীব্র চাপ, ব্যথা, আঁটসাঁট ভাব অথবা জ্বালাপোড়া অনুভব করা, যা কয়েক মিনিট ধরে স্থায়ী হতে পারে। এই ব্যথা চোয়াল, ঘাড়, পিঠ, বাহু (বিশেষত বাম বাহু) এবং পেটের উপরের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • শ্বাসকষ্ট: বুকে ব্যথার সাথে বা ছাড়াও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
  • ঘাম: ঠান্ডা ঘাম হওয়া।
  • বমি ভাব বা বমি: বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া।
  • মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: দুর্বলতা বা হঠাৎ মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি: অস্বাভাবিক এবং আকস্মিক ক্লান্তি অনুভব করা।

হার্ট অ্যাটাকের কারণ:

  • করোনারি ধমনীতে ব্লকেজ: মূলত কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য ফ্যাট জমা হয়ে রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া (atherosclerosis)।
  • রক্ত জমাট বাঁধা: সরু রক্তনালীতে হঠাৎ করে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া।

হার্ট অ্যাটাক হলে করণীয়:

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান অথবা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কল করুন। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, হৃদপেশীর ক্ষতি তত কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডাক্তাররা সাধারণত ইসিজি (ECG), রক্তের পরীক্ষা এবং এনজিওগ্রামের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন, যার মধ্যে রয়েছে রক্তনালীর blockage অপসারণের জন্য ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং অথবা বাইপাস সার্জারি।


হার্ট ফেইলর (Heart Failure): হৃদযন্ত্রের দুর্বল পাম্পিং ক্ষমতা

হার্ট ফেইলর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা, যেখানে হৃদপিণ্ড শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে পারে না। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন ও পুষ্টির অভাব দেখা দেয় এবং বিভিন্ন অঙ্গে জল জমা হতে শুরু করে।

হার্ট ফেইলরের লক্ষণ:

  • শ্বাসকষ্ট: অল্প পরিশ্রমে বা এমনকি বিশ্রামরত অবস্থায়ও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বিশেষত রাতে শোয়ার সময়।
  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সারাক্ষণ ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব করা।
  • পা ও গোড়ালিতে ফোলা: শরীরে অতিরিক্ত জল জমার কারণে পা, গোড়ালি এবং পেটে ফোলাভাব দেখা দেওয়া।
  • দ্রুত হৃদস্পন্দন: হৃৎপিণ্ড দ্রুতগতিতে ধড়ফড় করা।
  • কাশি: বিশেষত রাতে শোয়ার সময় শুকনো কাশি হওয়া।
  • পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি: পেটে জল জমার কারণে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি অনুভব করা।

হার্ট ফেইলরের কারণ:

  • হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস: পূর্বে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে হৃদপেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
  • উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
  • করোনারি ধমনী রোগ: হৃদপিণ্ডের রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া।
  • ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদপেশী এবং রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে।
  • হার্টের ভাল্বের সমস্যা: ভাল্বের ত্রুটির কারণে হৃদপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
  • মায়োকার্ডাইটিস: হৃদপেশীর প্রদাহ।
  • জন্মগত হৃদরোগ: কিছু জন্মগত ত্রুটির কারণে হার্ট ফেইলর হতে পারে।

হার্ট ফেইলর হলে করণীয়:

হার্ট ফেইলরের চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া এবং এর মূল লক্ষ্য হলো রোগের progression কমানো, লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। ডাক্তাররা সাধারণত ওষুধ (যেমন – এসিই ইনহিবিটর, বিটা ব্লকার, ডাইইউরেটিক), জীবনযাত্রার পরিবর্তন (যেমন – লবণ কম খাওয়া, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ) এবং কিছু ক্ষেত্রে ডিভাইস থেরাপি (যেমন – পেসমেকার, আইসিডি) অথবা হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দিতে পারেন।


ডা. রাকিবুল হাসান তুষারের পরামর্শ:

ডা. তুষার বলেন, “হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলর উভয়ই মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং এগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো সঠিকভাবে চেনা এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। রাজশাহীর মানুষের জন্য আমাদের এখানে আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং অভিজ্ঞ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হার্ট ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন স্থানে আপনারা আমার পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “জীবনযাত্রার সঠিক পরিবর্তন, যেমন – স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যেকোনো ধরনের বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক অনুভূতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।”

আপনার হৃদযন্ত্রের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।

মেইল লিস্টে যুক্ত হোন

Subscription Form

সার্চ করুন

আরোও পড়তে পারেন!

শেয়ার করুন:

চেম্বার

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার

রুম নং- ৩২৭, ৩য় তলা, ভবন-২
শেরশাহ রোড, লক্ষীপুর, রাজশাহী
প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত্রী ৮টা।

ম্যাপ লোকেশন