একটি হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো বড় ধরনের হৃদরোগের ঘটনা জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। এটি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক এবং জীবনযাপনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। তবে আধুনিক চিকিৎসা এবং সঠিক জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে একজন রোগী আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাকিবুল হাসান তুষার।
ডা. তুষার বলেন, “হৃদরোগের পর চিকিৎসা শেষ হয়ে গেলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং ভবিষ্যতে কোনো বিপদ এড়াতে নিয়মিত ফলোআপ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন অপরিহার্য।”
ফলোআপ কেন জরুরি?
হৃদরোগের পর চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. ওষুধের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: হৃদরোগের পর সাধারণত অনেক ধরনের ওষুধ সেবন করতে হয়। নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে চিকিৎসক ওষুধের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা সামলে নিতে পারেন।
২. রোগের পুনরাবৃত্তি রোধ: ফলোআপে চিকিৎসক আপনার স্বাস্থ্য অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারেন।
৩. শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ: ফলোআপের সময় রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং হৃদস্পন্দন নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। এই প্যারামিটারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৪. নতুন সমস্যার দ্রুত সমাধান: হৃদরোগের পর বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতার মতো নতুন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে ফলোআপের সময় তা নিয়ে আলোচনা করা যায় এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
জীবনধারা পরিবর্তনের মূলমন্ত্র:
ডা. তুষার বলেন, “হৃদরোগের পর জীবনধারার পরিবর্তনই হলো সুস্থ হৃদয়ের পথে ফেরার আসল চাবিকাঠি।” তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
* লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই কাঁচা লবণ এবং লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
* কম ফ্যাটযুক্ত খাবার: তেল, ঘি, মাখন, ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাবার কম খান। এর বদলে অলিভ অয়েল বা সানফ্লাওয়ার অয়েল ব্যবহার করুন।
* ফল ও সবজি: প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূল খান।
* মাছ: তৈলাক্ত মাছ (যেমন – ইলিশ, স্যামন) হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী।
২. নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ:
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হালকা বা মাঝারি ধরনের ব্যায়াম শুরু করুন। যেমন- প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইক্লিং করা।
* অতিরিক্ত পরিশ্রমের কাজ থেকে বিরত থাকুন।
৩. ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার:
* ধূমপান হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। হৃদরোগের পর অবশ্যই ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে হবে।
* অতিরিক্ত মদ্যপানও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে। তাই এটি সীমিত বা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত।
৪. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ:
* মানসিক চাপ হৃৎপিণ্ডের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। yoga, মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম অথবা শখের চর্চার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
৫. সঠিক ওজন বজায় রাখুন:
* অতিরিক্ত ওজন হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
ডা. তুষার বলেন, “রাজশাহীতে আমাদের এখানে উন্নত মানের diagnostic facility এবং follow-up-এর সুবিধা রয়েছে। হৃদরোগের পর কোনো সন্দেহ বা উদ্বেগ থাকলে, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হার্ট ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই হৃদরোগ থেকে সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।”