হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহী: হৃদরোগ চিকিৎসায় ডা. মোঃ রাকিবুল হাসান তুষারের অবদান
হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহী বর্তমানে উত্তরবঙ্গের অন্যতম নির্ভরযোগ্য হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের আদলে রাজশাহীতে ১৯৮৪ সালে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্যোগে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। শুরুতে এর কার্যক্রম রাজশাহী মহানগরীর মনিবাজার এলাকায় পরিচালিত হতো।
পরবর্তীতে রাজশাহীর বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবক ডা. মোঃ আব্দুল খালেক ১৯৯২ সালে মহানগরীর কেন্দ্রস্থল লক্ষীপুরের ‘বাকির মোড়ে’ প্রায় ৩১.৪৫ শতক জমি দান করেন। এরপর ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব জায়গা থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে হৃদরোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
এই প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসা নয়, বরং হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার ও জনসচেতনতামূলক পরামর্শ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP) “এস্টাবলিশমেন্ট অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, রাজশাহী” প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই একটি আধুনিক পাঁচতলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ভবনটিতে রয়েছে—
- ১টি আধুনিক ক্যাথল্যাব,
- ৮টি আইসিইউ (ICU) বেড,
- ১০টি সিসিইউ (CCU) বেড,
- ৬টি এইচডিইউ (HDU) বেড,
- ৬টি পিসিসিইউ (PCCU) বেড,
- ৬টি সাধারণ ওয়ার্ডে মোট ৫৩টি জেনারেল বেড,
- ১৭টি কেবিন, এবং
- একটি ইমারজেন্সি বিভাগ।
এছাড়াও শীঘ্রই এসব ইউনিটে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। এর ফলে রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের ধনী, দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবাই উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসা সেবা পাবে।
এই ফাউন্ডেশনে কর্মরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে সার্জারি ও পরবর্তী পরিচর্যা পর্যন্ত সর্বোচ্চ যত্নে সেবা প্রদান করেন।
ডা. মোঃ রাকিবুল হাসান তুষার
রাজশাহীতে হৃদরোগ চিকিৎসা এখন অনেক বেশি উন্নত ও সহজলভ্য, আর সেই উন্নতির ধারায় অন্যতম নাম ডা. মোঃ রাকিবুল হাসান তুষার। তিনি একজন দক্ষ ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, যিনি বহু বছর ধরে রাজশাহীর মানুষকে হৃদরোগের সেবা ও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলে হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তিনি
এমবিবিএস (রামেক), বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (কার্ডিওলজি – হার্ট ফাউন্ডেশন), এমএসিসি (আমেরিকা) এবং এক্স-কনসালটেন্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তার পরামর্শে নিয়মিত চেকআপ ও সচেতনতা হৃদরোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মনে রাখবেন, সময়মতো রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসাই জীবন বাঁচাতে পারে। আপনার হৃদযন্ত্রের সুরক্ষাই আপনার দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।
হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহীর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য
রাজশাহীতে হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাজশাহী বিভাগ ও আশেপাশের মানুষের হৃদরোগ ও হার্ট সম্পর্কিত যাবতীয় রোগের চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করা। সে সঙ্গে চিকিৎসক, সেবিকা এবং প্যারামেডিকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত যা একটি বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা সংগঠন। বেসরকারি পর্যায়ে এটি একটি বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল। হার্ট ফাউন্ডেশন কেবল হৃদরোগের সেবা নয়, হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমেও অংশ নিয়ে থাকে।
এর প্রধান উদ্দেশ্য সমূহঃ
- রোগী সেবা প্রদান: হৃদরোগ এবং রক্তসংবহন সংক্রান্ত অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা।
- গবেষণা ও প্রতিরোধ: হৃদরোগের কারণ, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- প্রশিক্ষণ প্রদান: চিকিৎসক, সেবিকা, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ও প্যারামেডিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি: হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করা।
- সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা: প্রান্তিক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সকল ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
হার্ট ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য
হার্ট ফাউন্ডেশন এর একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, যখন হৃদরোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো এবং রোগের কারণ গুলো বুঝা যাচ্ছিলো না। এর মূল লক্ষ্য গুলোঃ
- হৃদরোগ প্রতিরোধ করা,
- আক্রান্তদের দীর্ঘ, পরিপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করা এবং
- এই লক্ষ্যগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার জন্য অর্থায়ন করা।
তারপর থেকে, হৃদরোগ সম্পর্কে জানা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা হয়েছে। কিন্তু অগ্রগতি সত্ত্বেও, হৃদরোগচ, মৃত্যু এবং অক্ষমতার প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে, যা আমাদের সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের উপর সমান প্রভাব ফেলে।
রাজশাহীতে হৃদরোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা
রাজশাহীতে হৃদরোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিশাল। কারণ অধিকাংশ হৃদরোগের চিকিৎসা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে বা বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য মানুষের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাজশাহী ও আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও জরুরি সেবা প্রদানে হার্ট ফাউন্ডেশন অনেক বড় অবদান রাখে। এছাড়া, রাজশাহীতে স্ট্রোকের মতো জরুরি অবস্থার দ্রুত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর ও ভাল্বের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আধুনিক কার্ডিওলজি সুবিধা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার প্রায় সব সুবিধা ঢাকায় সীমাবদ্ধ। রাজশাহীতে উন্নত কার্ডিওলজি সেবা সিস্টেম তৈরি করতে পারলে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।
- স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। রাজশাহীর নিজস্ব কার্ডিওলজি ইউনিট থাকলে রোগীরা দ্রুত সেবা পাবেন এবং জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
- স্ট্রোকের পর দ্রুত ইনজেকশন দিতে পারলে জীবন বাঁচে ও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। রাজশাহীর নিজস্ব ব্যবস্থায় এই ধরনের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে।
- রাজশাহীর নিজস্ব কার্ডিওলজি বিভাগে হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর, ভাল্বের সমস্যা ও বাতজ্বরের মতো বিভিন্ন রোগের উন্নত চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া যাবে।
- উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকলে রাজশাহী ও এর আশপাশের এলাকার রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হবে না, যা তাদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় করবে।
হার্ট ফাউন্ডেশনের মূল বৈশিষ্ট্যঃ
- সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হৃদরোগের সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা করা হয়।
- শতকরা ৩০ ভাগ গরিব হৃদরোগীর বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। ফ্রি চিকিৎসাসেবার আওতায় রোগীর বিছানা ভাড়া, ডায়েট এবং ডাক্তার, নার্স ও অন্য স্টাফদের সেবা ও প্রয়োজনীয় মৌলিক পরীক্ষা যেমন : প্যাথলজি, এক্সরে, ইসিজি এবং ওষুধ দেওয়া হয়।
- নিয়মিতভাবে ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিকসদের জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু রয়েছে এবং নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এই হাসপাতালে এমডি (কার্ডিওলজি), এমএস (কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি) কোর্স চালু রয়েছে।
- এই হাসপাতালের সাথে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম রয়েছে।
- এ ছাড়া হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে জনগণকে শিক্ষিত ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য এই ফাউন্ডেশনে বিভিন্ন গণমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
- বিভিন্ন সময়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়োজিত ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অবদান রাখছে।
হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়
হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য
- স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ,
- নিয়মিত ব্যায়াম,
- ধূমপান বর্জন,
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা,
- মানসিক চাপ কমানো
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- রক্তচাপ ও
- কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
হৃদরোগের চিকিৎসাঃ
চিকিৎসা মূলত ঝুঁকি কমানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ সনাক্তকরণের উপর নির্ভরশীল, যার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। ।
তাছাড়া চিকিৎসার বিষয় নিম্নোক্ত বিষয় গুলো মনে রাখা জরুরিঃ
- হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- প্রয়োজনে অ্যাসপিরিন বা অ্যান্টিকোয়ুল্যান্ট ব্যবহার করতে পারেন, তবে এটি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।
- নিয়মিত চেক-আপ এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা গ্রহণ করুন
সচেতনতা বৃদ্ধিঃ
- হৃদরোগ এর বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্ব হার্ট দিবস এবং গো রেড ফর উইমেন-এর মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
- হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য জীবনধারায় পরিবর্তন আনার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় #হৃদরোগ প্রতিরোধ বা #বিশ্বহার্টদিবস-এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সচেতনতা তৈরি করা।